News

মিরসরাই ইকোনমিক জোন বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে কতটুকু সফল

কয়েক বছর আগের কথা। কোন একটি পত্রিকা মারফত একটি নিউজ ছেপেছিল। সেখানে তুলনা করা হয়েছিল বাংলাদেশ কেন ভারতের মত শিল্পে শক্তিশালী হতে পারছে না। উদাহরণ হিসাবে বাংলাদেশেএ বেজা অথবা বেপজা (আমার সঠিক মনে নেই) একটি দল ভারত ভ্রমণে যায়। সেখানে তারা গুজরাটের একটি অর্থনৈতিক জোন পরিদর্শন শেষে আক্ষেপের সাথে বলে, ভারতের এই অর্থনৈতিক জোন এমন […]

কয়েক বছর আগের কথা। কোন একটি পত্রিকা মারফত একটি নিউজ ছেপেছিল। সেখানে তুলনা করা হয়েছিল বাংলাদেশ কেন ভারতের মত শিল্পে শক্তিশালী হতে পারছে না। উদাহরণ হিসাবে বাংলাদেশেএ বেজা অথবা বেপজা (আমার সঠিক মনে নেই) একটি দল ভারত ভ্রমণে যায়। সেখানে তারা গুজরাটের একটি অর্থনৈতিক জোন পরিদর্শন শেষে আক্ষেপের সাথে বলে, ভারতের এই অর্থনৈতিক জোন এমন ভাবে করা হয়েছে যে একটি শিল্প প্রতিষ্ঠার জন্য যাবতীয় যত সুবিধা দরকার তার সব কিছুই সেখানে আছে। রেডি প্রকল্প। প্লট রেডি করা। বিদ্যুৎ সংযোগ, গ্যাস ও পানির সংযোগ রয়েছে প্রতিটা প্লটে। সেই সাথে রয়েছে প্রসস্থ রাস্তা। নিকটের বন্দর গুলিও প্রস্তুত। কেউ শিল্প স্থাপন করতে চাইলে জমি ইজারা নিয়েই কাজ শুরু করতে পারে। কোন জটিলতা নেই। আক্ষেপের সুরে বলা হয়েছিল বাংলাদেশে কোন অর্থনৈতিক জোন নাই যেখানে পরিদর্শন করেই এসব সুবিধা আমরা দিতে পারব। একজন বিদেশি যখন বিনিয়োগ করবেন তারা ভারতের প্লট দেখলেই চোখ বুজে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন যে এখানে আগামীকাল থেকেই শিল্প স্থাপনের কাজ শুরু করা সম্ভব। সেখানে এত সুবিধা দেখে একজন বিদেশী কেন বাংলাদেশে শিল্প স্থাপনে আগ্রহী হবে? আমরা তো জমি দিতে পারিনা। বিদ্যুৎ দিতে পারিনা। বন্দর সুবিধা এত ভাল ভাবে দিতে পারছি না। যাহোক এরপরপরি বাংলাদেশ দ্রুততার সাথে ইকোনমিক জোন করার সিদ্ধান্ত নেয়। তাও ১০০ টা। অন্য ইকোনমিক জোন নিয়ে কথা বলব না। বলব মিরসরাই ইকোনমিক জোন নিয়ে। মিরসরাই আমার জানা মতে উপমহাদেশের সব থেকে বড় ইকোনমিক জোন। ৩০,০০০ একর জমি নিয়ে এর অবস্থান।কিছু বিশেষ কারনে সারা বিশ্ব উঠেপড়ে লেগেছে এখানে এক খন্ড জমি পাবার জন্য। কিন্ত কেন?বেশিনা কয়েক বছর আগেই এই ইকোনমিক জোন এলাকায় মানুষ যেত না। রাস্তা নেই। জনমানব কম। চর এলাকা। ডাকার এর ভয়। ঠিক সেরকম একটি এলাকাকে বাংলাদেশ রুপান্তর করতে পেরেছে বিশ্বের সব থেকে আকর্ষণীয় একটি বিনিয়োগের ঠিকানা হিসবে। উদ্বোধন হল সেদিন, ২০১৮ সালের ২৪ জানুয়ারী । এক বছর হতে এখনো বাকি। এখনো মাটি ভরাট করে পুরো জোন প্রস্তুত সম্ভব হয়নি। তাইলে এত আগ্রহ কেন? ঠিক কেমন আগ্রহ এখানে অথবা ঠিক কত টাকা এখন পর্যন্ত বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে?মজার ব্যাপার হল এই ইকোনমিক জোনে এখন পর্যন্ত বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছে মোট $১২.৪০ বিলিয়ন ডলারের। টাকার অঙ্কে যেটা ১ লক্ষ কোটি টাকার বেশি। মোট ৫৫টি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে ৩ হাজার ৮২৭ একর জমি দেওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে।এছাড়া সরকারি সংস্থার মধ্যে মিরসরাইয়ে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষকে (বেপজা) প্রায় ১ হাজার ৫৫ একর জমি দিয়েছে বেজা। ভারতও সেখানে ১ হাজার একর জমি নিচ্ছে। পোশাক রপ্তানিকারকদের জন্য সেখানে ৫০০ একর জমি দিয়েছে বেজা। চীন, জাপান, যুক্তরাজ্য, ভারত, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বিনিয়োগকারীরা জমি পেতে আবেদন করেছেন।মীরসরাইয়ে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ প্রস্তাব করেছে পিএইচপি গ্রুপ। পিএইচপি স্টিল ওয়ার্কস বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে সেখানে স্টিল মিল স্থাপন করবে।এই গ্রুপ ৫৬৪ একর জমিতে স্টিল মিলসহ বিভিন্ন খাতে দুই ধাপে ৩২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করার প্রস্তাব দিয়েছে। পাশাপাশি ৫০০ একর জমি বরাদ্দ পেয়েছে বসুন্ধরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকোনমিক জোন। এতে আধুনিক পাল্প অ্যান্ড বোর্ড মিলসহ বিভিন্ন উৎপাদনমুখী শিল্প স্থাপন ও ইকোনমিক জোনের উন্নয়নে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হবে।এই জোনে প্রায় দুই হাজার একর জমিতে বিনিয়োগ করতে চায় বসুন্ধরা, পিএইচপি, কেএসআরএম, বিএসআরএম, ঝেজিয়াং, কুনমিংসহ বিভিন্ন শিল্প গ্রুপ।এছাড়া ১ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে সামিট চিটাগাং পাওয়ার, ২০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে চায় সিরাজ সাইকেল ইন্ডাস্ট্রি, বিপিডিবি আরপিসিএল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বিনিয়োগ করতে চায় ১ হাজার কোটি টাকা, আরব-বাংলাদেশ ফুড ১০০ কোটি টাকা, গ্যাস-১ লিমিটেড ২০০ কোটি টাকা, ফন ইন্টারন্যাশনাল ২০০ কোটি টাকা, ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল সাড়ে ৫০০ কোটি টাকা, আরমান হক ডেনিমস ১০০ কোটি টাকা এবং অর্কিড এনার্জি ২০০ কোটি টাকা।এদিকে বাংলাদেশ এডিবল ওয়েল লিমিটেড ৪০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে। তারা শুরুতে ৫০ একর জমি চেয়েছিল। কিন্তু পরে জমি ভাগে পাবে কিনা সেই আশঙ্কায় ১০০ একর জমি চেয়েছে। চীনের একটি কেমিক্যাল প্রতিষ্ঠান তড়িঘড়ি করে এখানে কারখানা স্থাপন করতেছে। দেশের একটি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে কারখানা করে ফেলেছে। উপরের কান্ড গুলি দেখে হয়ত বুঝেছেন এটা কে জমি পাবার জন্য কাড়াকাড়ি চলার কথা কেন বলেছি। #কি_থাকছে_মিরসরাই_ইকোনমিক_জোনে?এক্ষেত্রে শুরুতেই বলতে হবে অবকাঠামোর কথা। অবকাঠামো তে এরকম ইকোনমিক জোন বিশ্বে খুব কম আছে। এটা এমন একটি ইকোনমিক জোন যেখানে এই জোনের প্রতিষ্ঠান গুলির জন্যই থাকছে আলাদা সমুদ্র বন্দর। হ্যা ঠিল শুনেছেন। জাপানের সজিত কর্পোরেশন প্রায় $২ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেছে এখানে সমুদ্র বন্দর, বিদ্যুৎ কেন্দ্র করার জন্য। এই বন্দর দিয়ে এই জোনের প্রতিষ্ঠান গুলি দ্রুত আমদানি রপ্তানি করবে। মিরসরাইয়ে এখন ভূমি উন্নয়নের পাশাপাশি গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের কাজ চলছে। এ অর্থনৈতিক অঞ্চলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি দেবে সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরণি নামে চার লেনের একটি সড়ক ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত হবে।৭ হাজার ৭১৬ একর জমিতে এবং সমুদ্র তীরবর্তী জেগে ওঠা ১৫ হাজার একর জমির মধ্যে ৪টি মৌজায় ৬ হাজার ৩৯০ একর জায়গায় শুরু হয়েছে কর্মযজ্ঞ। চায়না হারবার কোম্পানির তত্ত্বাবধানে সেখানে নির্মিত হচ্ছে অবকাঠামো, তৈরী হচ্ছে সড়ক যোগাযোগ।ইতোমধ্যে মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে তৈরি হয়েছে ১৯ কিলোমিটার পাকা সড়ক। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে মীরসরাই ইপিজেড পর্যন্ত নির্মাণ হচ্ছে চার লেনের আরও ১০ কিলোমিটার শেখ হাসিনা অ্যাভিনিউ। মেরিন ড্রাইভ সড়ক সংযুক্ত হচ্ছে এই অঞ্চলের সঙ্গে।সমুদ্র উপকূল ঘেঁষে ১২’শ কোটি টাকা ব্যয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড, নেভি ও চায়না হারবার কোম্পানি সাড়ে ১৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের মেরিন ড্রাইভ সড়ক নির্মাণ করছে। কারখানায় পানি সরবরাহের জন্য দুই একর জমিতে তৈরি করা হবে জলাধার। গ্যাস সরবরাহের জন্য ২৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে পাইপলাইন বসাচ্ছে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি। রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড স্থাপন করবে ১৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র। এছাড়া ১ হাজার ৮০০ মেগাওয়াটের আরও একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র করার জন্য বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের কাছে চাওয়া হয়েছে ৫০ একর জমি।২০১৯ সালের শেষ নাগাদ মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের ১০ হাজার একর জমি বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। ২০৩০ সালে পূর্ণাঙ্গভাবে শিল্পশহর চালু হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। পুরো কাজ শেষ হলে এখানে কর্মসংস্থান হবে প্রায় ৩০ লাখ লোকের।আর এখানে যে পরিমান রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হবে তা হয়ত আমাদের দেশের বর্তমান রপ্তানির সমান হলেও অবাক হব না। যেখানে ১৮০০ মেগাওয়াট এর বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। ডেডিকেটেড সমুদ্রবন্দর রয়েছে। থাকছে বিশাল বিশেষায়িত জায়গা, ইউটিলিটি সংযোগ সেই ইকোনমিক জোন এ এক খন্ড জমি পাওয়া নিয়ে যে কাড়াকাড়ি পড়বে সেটাই স্বাভাবিক। #wasimahin

Defence Research Forum- DefRes

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *